প্রিয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সম্মানিত শুভানুধ্যায়ীবৃন্দ,আপনাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগতম। রামু খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের শিক্ষার প্রসার, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় অবস্থিত একটি স্বনামধন্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আমাদের লক্ষ্য শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা প্রদান নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত করে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের ওপর আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল ভিত্তি। আমি বিশ্বাস করি, সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের বিদ্যালয় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং জাতি গঠনের লক্ষ্যে আরও এগিয়ে যাবে।
আমি আমাদের সকল শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সাফল্য এবং দেশের কল্যাণ কামনা করছি।
ধন্যবাদান্তে,
প্রধান শিক্ষক
রামু খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
রামু, কক্সবাজার
উ. খিজারী রামুর শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সমাজসেবায় উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে অনেকের। সমাজ ও জনপদ তাঁদের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ-- তাঁরা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবার নয়। সমাজ যাকে গড়ে সে তুচ্ছ হয় কিন্তু যিনি সমাজকে গড়েন তিনি হন মহান। তাই সমাজ থেকে তাঁরা কোনো প্রতিদান চান না। তাই বলে সমাজ তাঁদের ভুলে যেতে পারে না কিংবা ভুলে যাবার ভান করতে পারে না। গুণীর সমাদর করার সাধনায় যদি সমাজ পিছিয়ে পড়ে তাহলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রগতিহীন সমাজ আগাছায় ভরে যায়। সমাজ হিতৈষী দানশীল উ. খিজারী রম্যভূমি রামুতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মসাল নিয়ে অনেকের মধ্যে মতের অমিল রয়েছে। তবে বিভিন্ন লেখনিতে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দকে জন্ম এবং ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দকে তাঁর মৃত্যুসাল হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি যে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তার নাম লাওয়ে (সেনাপতি) পাড়া। পরবর্তীতে এই এলাকা মগপাড়া (হাইটুপী) নামে পরিচিত হয়। রাখাইন পরিবারে জন্ম নেওয়া উ. খিজারীর পিতা পাপ্রু সিকদার অত্যন্ত ধনী ছিলেন। পারিবারিক জীবনে তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই ও দুই বোন। পাঁচ ভাইয়ের নাম মংহ্লা, খিজারী, দোপ্রং, মংঙ্গী ও হাথোঁ। আর দুই বোন আমো ও ছেংপ্রু। উ. খিজারী ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। তবে এক বড় মাপের সওদাগর ছিলেন। জানা যায়, তিনি মায়ানমার (বার্মা), বাংলাদেশ ও ভারতের সাথে বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করতেন। অন্যান্য ধনী ব্যবসায়ীদের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করতেন। তখন এদের বলা হত 'জেনারেল মার্চেন্ট এন্ড কমিশন এজেন্ট'। এজন্য হয়তো তাঁকে উ. খিজারী দালাল ডাকা হতো। তিনি নিজেও একজন বড় মাপের ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন এবং সেই সূত্রে তিনি অন্যান্য সম্ভ্রান্ত সওদাগরের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন মাত্র। উ. খিজারী উপলব্ধি করলেন রামুতে শিক্ষা বিস্তারে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেই ভাবনা সেই কাজ। তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় পুরোদমে নেমে গেলেন। মায়ানমারের আকিয়াব থেকে তিনি সিদ্ধ করা কাঠ এনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করলেন। তিনি ১৯১৪ সালে একক প্রচেষ্টা ও একক অর্থায়নে রামুতে ২.৪৭ একর জমিতে কাঠের তৈরি একটি দোতলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এক যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। জনশ্রুতি আছে যে এটি কক্সবাজার জেলার (তখনকার মহকুমা) সর্বপ্রথম উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় 'রামু খিজারী উচ্চ বিদ্যালয়'। জানা যায়, তিনি সম্পূর্ণ এককভাবে বিদ্যালয়ের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মানী তিনি নিজ তহবিল থেকে দিতেন। ক্রমে বিদ্যালয়ের সুনাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করতেন। তাঁর বলিষ্ঠ ও যোগ্য নেতৃত্বে সুদীর্ঘকাল ধরে উক্ত বিদ্যালয় মানসম্মত পড়ালেখা ও ফলাফলের বিচারে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল। ফলে এর সুনাম জেলার গণ্ডি পেরিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে গড়ে। একপর্যায়ে তৎকালীন সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করে। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন। তিনি খিজারীর সাথে দেখা করলেন এবং সাহায্য সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেন। তাঁর প্রস্তাবের জবাবে খিজারী এক বাক্যে বলেছিলেন, 'আই এম এ রিচ ফান্ড।' তাঁর কথা, তিনি বাইরের কোনো সাহায্য সহযোগিতা গ্রহণ করবেন না। তিনি যত দিন বেঁচে থাকবেন ততদিন একাই চালিয়ে নিয়ে যাবেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হত ১-৩ তারিখের মধ্যে। তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মানী পৌছে দিতেন প্রতিমাসের ঠিক এক তারিখে। বিদ্যালয়ের আয়ের উৎসের কথাও তিনি ভেবেছিলেন। এখন বিদ্যালয়ের অধীনে ৩২টি দোকানের মালিকানা আছে। বিদ্যালয়ের নামে বেশি পরিমাণ জায়গা ক্রয় করার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও তিনি এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারেও ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯১৯ সালে রামু বার্মিজ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়েছে। রামুর শিক্ষা বিস্তারে উ. খিজারী যে অবদান রেখে গেছেন তা অবিস্মরণীয়। তাঁর গড়ে যাওয়া এই শিক্ষা নিকেতন থেকে আলোকিত হয়েছেন অনেকে, জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন অনেকে। এদের অনেকেই বাষ্ট্রের শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ভূমিকা রেখে চলেছেন। উ. খিজারী শিক্ষা বিস্তারের কাজ করার পাশাপাশি সমাজসেবায়ও পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতেন। জনকল্যাণকর কাজ করেছেন অনেক জায়গায়। তাঁর কাজের সেবা পেয়েছেন সবাই। উক্ত বিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করে যাওয়া কিংবা অধ্যয়নরত অসংখ্য শিক্ষার্থী জানে না বিদ্যালয়ের নামের আগে খিজারী শব্দটি কেন ব্যবহার করা হয়েছে। এটা খায় না গায়ে মাখে। গুণীজন বলেন, সাগরে কত মণিমুক্তা অরণ্যে কত ফুল ফোটে কিন্তু কার খবর কে রাখে অনাদরে তা ঝরে যায় ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, 'যে সমাজে গুণীর সমাদর হয় না, সেই সমাজে গুণী জন্মায় না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে সমাজের কীর্তিমান এবং গুণীজনদের স্মরণ করতে হয় সমাজের প্রয়োজনেই।